অরিন্দম সেনের আর চাঁদ দেখা হয়ে ওঠে না।
একসময় চাঁদ ছিল তার নিত্যসঙ্গী। গ্রামের মেঠোপথে হাঁটতে হাঁটতে মনে হতো, আকাশের ওই রুপোলি গোলকটাও বুঝি তার সঙ্গে সঙ্গে পথ চলছে। জ্যোৎস্না রাত মানেই ছিল ছাদের কার্নিশে বসে থাকা, কিংবা উঠোনের এক কোণে চুপচাপ শুয়ে আকাশ দেখা। তখন সময় ছিল, স্বপ্ন ছিল, অপেক্ষা ছিল।
তারপর জীবন এসে পড়ল।
জীবননদী বড় দ্রুত বয়ে যায়। কখনও কখনও এত দ্রুত যে মানুষ বুঝতেই পারে না, ঠিক কোন মোড়ে এসে সে নিজের সবচেয়ে প্রিয় জিনিসগুলো ফেলে এসেছে। এই তো সেদিন কলেজের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের রঙিন স্বপ্ন দেখত যে ছেলেটা, আজ তার বয়স বেয়াল্লিশ।
এখন সে শহরের এক বহুজাতিক কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। বেতন, পদমর্যাদা, সম্মান—সবই আছে। দক্ষিণ কলকাতার বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, দামি গাড়ি, ব্যাংকের সঞ্চয়—সাফল্যের যে চেহারা সমাজ কল্পনা করে, তার প্রায় সবটুকুই অর্জন করেছে অরিন্দম।
বেয়াল্লিশ বছর বয়সেও অরিন্দম অবিবাহিত। জীবন যখন ভালোবাসার দরজায় কড়া নেড়েছিল, তখন সে ব্যস্ত ছিল ভবিষ্যৎ নির্মাণে। আর যখন একটু থেমে পেছন ফিরে তাকিয়েছে, তখন দরজার ওপারে শুধু নীরবতা দাঁড়িয়ে ছিল।
গতরাতে অফিস থেকে ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল।
ফ্ল্যাটের দরজা খুলতেই নিস্তব্ধতা তাকে স্বাগত জানায়। এই নীরবতার সঙ্গে তার বহু বছরের পরিচয়। তবু কিছু কিছু রাত থাকে, যখন পরিচিত নিঃসঙ্গতাও নতুন করে বুকের ভেতর শব্দ তোলে।
পোশাক না বদলিয়েই জানালার সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল সে।
বারো তলার কাঁচঘেরা জানালার ওপারে রাতের শহর তখন আলোর মালা পরে দাঁড়িয়ে।
আর তারও ওপরে—
চাঁদ।
মেঘের ফাঁক গলে বেরিয়ে আসা গোল, শান্ত, নির্লিপ্ত চাঁদ।
কত বছর পর যেন সত্যি সত্যিই তাকে দেখল অরিন্দম।
তার মনে হলো, পৃথিবীতে কিছু কিছু জিনিস বড্ড একগুঁয়ে। তারা বদলায় না। বদলে যায় শুধু মানুষ।
পরদিন রবিবার।
মানুষের মন বড় বিচিত্র। অষ্টাদশী চঞ্চলার মতো সে ক্ষণে ক্ষণে রূপ বদলায়। গতরাতের জ্যোৎস্নাভেজা আবেগ সকালের আলোয় অনেকটাই ফিকে হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অদ্ভুতভাবে তা হলো না।
বরং ঘুম ভাঙার পর থেকেই বুকের ভেতর এক ধরনের অস্থিরতা জমতে শুরু করল।
আজ কোনো কাজ করতে ইচ্ছে করছে না।
অন্যদিন ছুটির সকাল মানেই অফিসের ফাইল, মেইল আর মিটিংয়ের প্রস্তুতি। আজ ল্যাপটপটা বন্ধই পড়ে রইল।
শীতের শহর তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। কুয়াশার পাতলা চাদর সরিয়ে ধীরে ধীরে সকাল নামছে রাস্তায়। কোথাও দোকানের ঝাঁপ উঠছে, কোথাও চায়ের কাপে প্রথম ধোঁয়া উড়ছে।
অরিন্দম হাঁটছিল।
দীর্ঘদেহী, সুগঠিত শরীর, প্রশস্ত কাঁধ আর সংযত ব্যক্তিত্ব তাকে এখনও ভিড়ের মধ্যে আলাদা করে চেনায়। মুখাবয়বে ছিল এক ধরনের স্থির আত্মবিশ্বাস, যা দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের পরিচয় বহন করে। পথ চলতে গিয়ে আজও অনেক চোখ অজান্তে একবার তার দিকে ফিরে তাকায়।কিন্তু অরিন্দম সেসবের কিছুই খেয়াল করছিল না।
কোনো এক অদৃশ্য টানে সে গঙ্গার দিকে যেতে চাইছিল।
নদীর ধারে বসতে।
কোনো হিসাব ছাড়া, কোনো লক্ষ্য ছাড়া, কোনো প্রয়োজন ছাড়া।
শুধু কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকতে।
গঙ্গার ধারে এসে অরিন্দম একটি পুরোনো সিমেন্টের বেঞ্চে বসে পড়ল।
এই দিকটায় সচরাচর খুব বেশি লোকজন আসে না। শহরের ব্যস্ততা যেন এখানে এসে অনেকটাই থেমে যায়। একটু দূরে দু-একটি চায়ের দোকান। প্রাতঃভ্রমণ সেরে ফেরা কয়েকজন মানুষের জন্যই বোধহয় তাদের অস্তিত্ব। কেতলির মুখ থেকে ধোঁয়া উঠছে, সঙ্গে ভেসে আসছে চায়ের পাতার মিষ্টি গন্ধ।
আরও খানিকটা দূরে একটি স্নানের ঘাট। সেখানে গুটিকয়েক পুণ্যার্থী সকালবেলার পূজা-অর্চনা আর স্নানে ব্যস্ত। কারও ঠোঁটে মন্ত্রোচ্চারণ, কারও হাতে ফুল আর প্রদীপ। নদীর বুক থেকে ভেসে আসা হালকা কুয়াশা আর ঘাটের ঘণ্টাধ্বনি মিলেমিশে এক অদ্ভুত শান্ত পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।
অরিন্দম চুপচাপ বসে রইল।
সামনের গঙ্গা নিজের ছন্দে বয়ে চলেছে। যেন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের সুখ-দুঃখ, প্রার্থনা, ব্যর্থতা আর ভালোবাসার গল্প শুনে এসেও তার কোনো তাড়া নেই।
অরিন্দম নদীর দিকে তাকিয়ে বসে ছিল। কতক্ষণ কেটে গেছে, তার হিসাব সে রাখেনি।
হঠাৎ পিছন থেকে ভেসে এল একটি কণ্ঠস্বর—
— "মাফ করবেন, আপনি কি অরিন্দম সেন?"
অরিন্দম প্রথমে খেয়াল করেনি। প্রশ্নটা দ্বিতীয়বার শোনার পর ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল।
তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে প্রথম মুহূর্তে চিনতে পারল না সে।
মাঝারি উচ্চতা, সামান্য ভুঁড়ি, মাথার সামনের চুল অনেকটাই পাতলা হয়ে এসেছে। কিন্তু মুখের হাসিটা যেন কোথাও দেখা।
লোকটিই হেসে বলল,
— "চিনতে পারছিস না তো? আমি সৌমেন... সৌমেন মিত্র।"
নামটা শুনতেই যেন বহুদিনের ধুলো জমা স্মৃতির দরজা খুলে গেল।
কলেজের সেই দিনগুলো। ক্যান্টিনের আড্ডা। পরীক্ষার আগের রাতের পড়া। অকারণ হাসাহাসি। ভবিষ্যৎ নিয়ে অসংখ্য পরিকল্পনা।
অরিন্দম অবাক হয়ে উঠে দাঁড়াল।
— "সৌমেন! তুই?"
দু'জনেই কয়েক সেকেন্ড একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল।
সময় মানুষের চেহারা বদলে দেয়, কিন্তু কিছু কিছু হাসি বদলাতে পারে না।
সৌমেন বেঞ্চের একপাশে বসে পড়ল।
— "বিশ বছর পর দেখা হচ্ছে, তাই না?"
অরিন্দম নদীর দিকে তাকিয়ে হালকা হাসল।
— "হয়তো তারও বেশি।"
গঙ্গার জল তখনও নিজের ছন্দে বয়ে চলেছে। আর দুই পুরোনো বন্ধুর মাঝখানে ধীরে ধীরে ফিরে আসছিল বহু বছর আগে হারিয়ে যাওয়া এক সময়।
সৌমেন বেঞ্চে বসে পড়েছিল অরিন্দমের পাশে।
প্রথম কয়েক মিনিট দু'জনেই যেন পুরোনো মুখের মধ্যে কলেজের সেই ছেলেটাকে খুঁজছিল। তারপর কথার বাঁধ ভাঙতে সময় লাগল না।
কে কোথায় আছে, কার কী অবস্থা, কোন অধ্যাপক এখনও বেঁচে আছেন, কার সঙ্গে কার যোগাযোগ আছে—একের পর এক গল্প চলতে লাগল।
— "তোর খবর তো মাঝেমধ্যে লিংকডইনে দেখি," সৌমেন বলল, "বড় সাহেব হয়ে গেছিস দেখছি।"
অরিন্দম হেসে মাথা নাড়ল।
— "বড় সাহেব না, বড় চাকর।"
সৌমেন হো হো করে হেসে উঠল।
— "বিয়ে করলি না কেন বল তো?"
প্রশ্নটা এমনভাবে করা হলো যেন উত্তরটা খুবই সহজ।
অরিন্দম কিছুক্ষণ নদীর দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর মৃদু হেসে বলল,
— "করে ওঠা হয়নি।"
— "করে ওঠা হয়নি, না করিসনি?"
— "দুটোই ধর।"
সৌমেন মাথা নাড়ল।
বয়স তাদের দু'জনেরই চল্লিশ পেরিয়েছে। এই বয়সে মানুষ সাধারণত জোর করে আর কারও ব্যক্তিগত জীবনে ঢুকতে চায় না।
তবু বন্ধুত্বের একটা পুরোনো অধিকার থাকে।
— "আমার কিন্তু বড় মেয়ে এবার কলেজে উঠল," গলায় গর্ব মিশিয়ে বলল সৌমেন।
অরিন্দম অবাক হয়ে তাকাল।
যে ছেলেটা একসময় কলেজ ক্যান্টিনে প্রেমপত্র লিখত, তার মেয়ে আজ কলেজে পড়ে।
সৌমেন মোবাইল বের করে ছবি দেখাতে লাগল। স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে—হাসিখুশি একটা পরিবার।
সৌমেন হঠাৎ বলল,
— "আজ আর কোনো কাজ আছে?"
— "না।"
— "তাহলে চল, দুপুরে আমার বাড়ি।"
— "না রে, থাক।"
— "চুপ কর। বিশ বছর পর দেখা হয়েছে। বউকে বলব কলেজের বন্ধু এসেছে। তোর না গেলে কিন্তু বাড়িতে ঢুকতে দেবে না।"
অরিন্দম হেসে ফেলল।
— "এখনও আগের মতো জোর করে কথা বলিস দেখছি।"
— "অবশ্যই। কিছু জিনিস বদলায় না।"
সৌমেন উঠে দাঁড়াল।
— "চল। আজ দুপুরের খাওয়া আমার বাড়িতে।"
অরিন্দম একবার নদীর দিকে তাকাল।
যে নির্জনতা খুঁজতে সে এখানে এসেছিল, সেটা হয়তো আর পাওয়া যাবে না।
তবু বহুদিন পর পুরোনো বন্ধুর আন্তরিক টানকে উপেক্ষা করার ইচ্ছে হলো না তার।
সে ধীরে ধীরে বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়াল।
গঙ্গার ওপর দিয়ে তখন হালকা রোদ ঝিকমিক করছে।
আর অরিন্দম জানত না, এই সাধারণ নিমন্ত্রণটাই হয়তো তার বহুদিনের স্থির জীবনের ছন্দে একটুখানি পরিবর্তনের সূচনা হতে চলেছে।
সৌমেনের বাড়িটি উত্তর কলকাতার এক পুরোনো পাড়ায়।
বাইরে থেকে দেখলে খুব সাধারণ। তিনতলা বাড়ি। বারান্দার গ্রিলে মানিপ্ল্যান্ট জড়িয়ে আছে। উঠোনের এক কোণে তুলসীমঞ্চ। বাড়ির গায়ে সময়ের ছাপ স্পষ্ট, তবু কোথাও যেন এক অদ্ভুত উষ্ণতা লেগে আছে।
গাড়ি থেকে নেমেই অরিন্দম বুঝতে পারল, বহুদিন এমন বাড়িতে তার আসা হয়নি।
এখানে মানুষের বসবাস আছে।
দরজা খুলতেই ভেসে এল রান্নার গন্ধ, কারও হাসির শব্দ, দূরে টেলিভিশনের আওয়াজ। বাড়িটা যেন নিঃশ্বাস নিচ্ছে।
— "এই যে, চলে এলাম!" সৌমেন চিৎকার করে উঠল।
মুহূর্তের মধ্যেই ঘরের ভেতর থেকে কয়েকজন বেরিয়ে এল।
সৌমেনের স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে—এক এক করে পরিচয় করিয়ে দিতে লাগল সে।
অরিন্দম ভদ্রভাবে সবার সঙ্গে কথা বলছিল, এমন সময় সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামার শব্দ হলো।
স্বাভাবিকভাবেই তার দৃষ্টি সেদিকে ঘুরে গেল।
একজন মহিলা ধীরে ধীরে নিচে নামছিলেন।
বয়স সম্ভবত ছত্রিশ-সাঁইত্রিশের কাছাকাছি।
শ্যামবর্ণ গায়ের রং, বড় বড় শান্ত চোখ, টানা ভুরু আর মুখজুড়ে এক ধরনের সংযত সৌন্দর্য। চোখে পড়ার মতো কিছু নয়, অথচ একবার তাকালে দ্বিতীয়বার না তাকিয়ে থাকা কঠিন।
সাদামাটা হালকা রঙের শাড়ি পরেছিলেন। কোনো বাড়তি সাজগোজ নেই। কিন্তু তার মধ্যে এমন একটা স্বাভাবিক আভিজাত্য ছিল, যা প্রসাধনের চেয়েও বেশি আকর্ষণীয়।
সৌমেন হেসে বলল,
— "পরিচয় করিয়ে দিই। এ আমার শালী, মেঘলা।"
মহিলা মৃদু হেসে নমস্কার করলেন।
— "আপনার কথা অনেক শুনেছি।"
অরিন্দমও নমস্কার জানাল।
— "আশা করি সব ভালো কথাই শুনেছেন।"
মেঘলার ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটল।
— "সেটা পরে বিচার করা যাবে।"
কথাটা খুব সাধারণ ছিল।
তবু অরিন্দমের মনে হলো, বহুদিন পর কেউ তার সঙ্গে এমন স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কথা বলল, যেখানে তার পদমর্যাদা বা পরিচয়ের কোনো গুরুত্ব নেই।
শুধু মানুষ হিসেবে।
আলাপ-আলোচনা, হাসি-ঠাট্টা আর দুপুরের জলযোগ সেরে যখন অরিন্দম সৌমেনের বাড়ি থেকে বেরোল, তখন বিকেল প্রায় নেমে এসেছে। পশ্চিম আকাশে সূর্যের আলো ধীরে ধীরে কোমল হয়ে আসছে।
অনেকদিন পর এমন একটি দিন কাটাল সে, যেখানে অফিসের কোনো আলোচনা ছিল না, কোনো লক্ষ্যপূরণের চাপ ছিল না, কোনো প্রেজেন্টেশনের হিসাব ছিল না। ছিল শুধু কিছু মানুষ, কিছু আন্তরিকতা আর কিছু ফেলে আসা দিনের গন্ধ।
গাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে অদ্ভুতভাবে তার মনে পড়ছিল প্রথম যৌবনের কথা।
প্রেমের কথা।
ভালোবাসার কথা।
এমন নয় যে প্রেম তাকে কোনোদিন স্পর্শ করেনি। আর পাঁচজন মানুষের মতো তার জীবনেও ভালো লাগা এসেছে, আকর্ষণ এসেছে, কাউকে ঘিরে স্বপ্ন দেখার দিনও এসেছে।
কিন্তু ভালোবাসা সম্পর্কে তার ধারণা বরাবরই একটু আলাদা ছিল।
অরিন্দম বিশ্বাস করত, প্রকৃত প্রেম অধিকার থেকে জন্মায় না; জন্মায় শ্রদ্ধা থেকে।
যেখানে মানুষ মানুষকে নিজের সম্পত্তি বলে ভাবতে শুরু করে, সেখানে ভালোবাসার চেয়ে ভয়, প্রত্যাশা আর দাবি বেশি জায়গা দখল করে নেয়।
প্রেমের সবচেয়ে বড় শক্তি বন্ধন নয়, মুক্তি।
যাকে ভালোবাসা যায়, তাকে নিজের মতো করে বাঁচার স্বাধীনতাও দিতে হয়।
হয়তো সেই কারণেই জীবনের অনেক সম্পর্কের সামনে দাঁড়িয়েও অরিন্দম কখনও কাউকে ধরে রাখতে শেখেনি। জোর করে কাউকে নিজের পাশে রাখার চেষ্টাও করেনি।
তার বিশ্বাস ছিল, যে সত্যিই ভালোবাসে সে ফিরে আসবে।
আর যে ফিরে আসে না, তাকে আটকে রাখার অধিকার কারও নেই।
গাড়ির দরজা খুলতে খুলতে সে একবার পেছন ফিরে তাকাল।
সৌমেনের বাড়ির বারান্দায় কেউ একজন দাঁড়িয়ে ছিল।
দূর থেকে মুখ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল না।
তবু অরিন্দমের মনে হলো, বিকেলের নরম আলোয় শ্যামবর্ণ একটি মুখ যেন মুহূর্তের জন্য তার দিকে তাকিয়ে আছে।
পরের মুহূর্তেই সে নিজের ভাবনায় হেসে ফেলল।
কিছু কিছু মানুষকে দেখার পর তাদের উপস্থিতি বাস্তবের চেয়ে স্মৃতিতে বেশি সময় ধরে রয়ে যায়।
বাড়ি ফিরে অরিন্দম আর কোনো কাজের কথা ভাবতে পারল না।
সারাদিনের ঘটনাগুলো অদ্ভুতভাবে তার মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে লাগল। গঙ্গার ধারের নির্জন সকাল, বহু বছর পর সৌমেনের সঙ্গে দেখা, তার বাড়ির আন্তরিক পরিবেশ, আর সেই শ্যামবর্ণ শান্ত মুখটি—সব মিলিয়ে দিনটা যেন সাধারণ কোনো রবিবারের মতো ছিল না।
সোফায় আধশোয়া অবস্থায় কখন যে তার চোখ লেগে এসেছিল, সে নিজেও বুঝতে পারেনি।
ঘুম ভাঙল মোবাইলের রিংটোনে।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল— "মামা"।
অরিন্দম তাড়াতাড়ি ফোনটা রিসিভ করল।
গত দু'দিন কাজের চাপে ফোন করা হয়নি। এমনিতে সপ্তাহে অন্তত দু-তিনবার ফোন করাই তার অভ্যাস। ওপ্রান্ত থেকে মামার কণ্ঠস্বর শুনেই বুকের ভেতর একটা পরিচিত উষ্ণতা অনুভব করল সে।
এই বিশাল পৃথিবীতে নিজের বলতে আসলে খুব বেশি কেউ নেই অরিন্দমের।
তার বাবা-মা দু'জনেই মারা গিয়েছিলেন যখন সে খুব ছোট। এতটাই ছোট যে আজ আর তাদের মুখও স্পষ্ট মনে পড়ে না। পুরোনো কয়েকটা ছবি আর কিছু অস্পষ্ট স্মৃতি ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।
তারপর থেকেই মামা আর মামিমাই ছিলেন তার আশ্রয়, তার ভরসা, তার পৃথিবী।
তাদের নিজেদের সংসার ছিল, সন্তান ছিল, দায়িত্ব ছিল। তবু সেই সংসারে অরিন্দম কোনোদিন আশ্রিত হয়ে থাকেনি; থেকেছে নিজের সন্তানের মতোই। নিজের ছেলে মেয়ের সঙ্গে যে স্নেহ, যে শাসন, যে মমতা ভাগ করে নিয়েছিলেন তারা, অরিন্দমও তার সমান অংশীদার ছিল।
স্কুলে প্রথম দিন হাত ধরে নিয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে পরীক্ষার আগের রাতের উদ্বেগ, অসুস্থতার সময় জেগে থাকা, কলেজে ভর্তি, চাকরির প্রস্তুতি—জীবনের প্রতিটি বাঁকে তারা তার পাশে দাঁড়িয়েছেন অবলম্বনের মতো।
অরিন্দম কখনও ভাবেনি যে সে বাবা-মা হারা।
কারণ জগতে একজন সন্তান যতটুকু স্নেহ, যতটুকু ভালোবাসা, যতটুকু নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার রাখে, তার চেয়েও বেশি সে পেয়েছে মামা-মামিমার কাছে।
রক্তের সম্পর্ক সবসময় ভালোবাসার গভীরতা মাপতে পারে না।
কিছু মানুষ সম্পর্কের সংজ্ঞা ছাড়িয়ে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠেন।
মামা আর মামিমা অরিন্দমের কাছে ঠিক তেমনই।
— "কেমন আছিস বাবা?" ওপ্রান্ত থেকে মামার কণ্ঠস্বর ভেসে এল।
বেয়াল্লিশ বছরের সফল কর্পোরেট অফিসার অরিন্দম সেনের কাছে এই একটি সম্বোধন আজও শৈশবের মতোই শোনায়।
কিছুক্ষণ খোঁজখবর নেওয়ার পর মামা বললেন,
— "সময় করে একবার চলে আয়। অনেকদিন তো আসিস না। তোর মামিমাও রোজ তোর কথা বলে।"
অরিন্দম কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
সত্যিই অনেকদিন যাওয়া হয়নি।
কাজ, মিটিং, দায়িত্ব আর ব্যস্ততার অজুহাতে কত গুরুত্বপূর্ণ মানুষকে যে মানুষ পিছনে ফেলে আসে, তা সে আজকাল আরও বেশি করে উপলব্ধি করে।
জানালার ওপারে সন্ধ্যা নেমে এসেছে।
শহরের একের পর এক আলো জ্বলে উঠছে।
অরিন্দম ধীরে ধীরে বলল,
— "এই সপ্তাহেই আসব মামা। কথা দিলাম।"
ওপ্রান্তে বৃদ্ধ মানুষটার কণ্ঠে যে আনন্দ ধরা পড়ল, তা কোনো বড় সাফল্য বা পদোন্নতির আনন্দের চেয়েও অনেক বেশি নির্মল।
ফোন কেটে যাওয়ার পর অরিন্দম অনেকক্ষণ নীরবে বসে রইল।
জীবনে অনেক কিছু অর্জন করেছে সে।
সম্মান, প্রতিষ্ঠা, অর্থ—কিছুই তার অজানা নয়।
তবু গভীরভাবে ভাবলে সে জানে, তার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি কোনো পদমর্যাদা নয়, কোনো ব্যাংক ব্যালান্স নয়।
তার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো কিছু মানুষ, যারা তাকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসেছে।
শুধু তার সাফল্যকে নয়—
মানুষ অরিন্দমকে।
কাজের মেয়েটি চা দিয়ে গিয়েছিল কিছুক্ষণ আগেই।
অরিন্দম কাপটা হাতে তুলে নিল। ধোঁয়া ওঠা চায়ে আস্তে করে চুমুক দিতে দিতে আবার মনে পড়ল মামার কথা।
মনে পড়ল তাদের জীবনের দীর্ঘ দুঃখের ইতিহাস।
ঈশ্বর বোধহয় কিছু কিছু মানুষকে একটু বেশি পরীক্ষা নেন। এক আঘাতের ক্ষত শুকিয়ে ওঠার আগেই আরেকটি আঘাত এসে হাজির হয়।
তার বড়ো মামাতো ভাই অর্ণব ছিল অসম্ভব মেধাবী। উচ্চশিক্ষার জন্য আমেরিকায় গিয়েছিল। পরে একটি খ্যাতনামা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিল।
সেই ছেলেটাই একদিন হঠাৎ নিজের জীবন শেষ করে দিল।
কোনো পূর্বাভাস ছিল না।
কোনো অভিযোগ ছিল না।
কোনো বিদায়বাণীও নয়।
একটি ছোট্ট বার্তা, কিছু অসমাপ্ত প্রশ্ন আর অসংখ্য উত্তরহীনতার মধ্যে শেষ হয়ে গেল একটি সম্ভাবনাময় জীবন।
আজও কেউ জানে না কেন।
কী এমন যন্ত্রণা ছিল তার ভেতরে, যা সে কাউকে বলতে পারেনি?
কী এমন অন্ধকার তাকে গ্রাস করেছিল?
প্রশ্নগুলো আজও প্রশ্ন হয়েই রয়ে গেছে।
সেদিনের পর মামা-মামিমার জীবনে যে নীরবতা নেমে এসেছিল, তার গভীরতা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
সন্তানের মৃত্যু পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী শোক—আর সে শোক যদি এমন আকস্মিক হয়, তবে তার ভার বহন করা আরও কঠিন।
তাদের আর একমাত্র মেয়ে ঐশী এখন নেদারল্যান্ডসে কর্মরত। একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে ডেটা সায়েন্টিস্ট হিসেবে কাজ করছে। মাঝে মাঝে ফোনে কথা হয়, ভিডিও কলে খোঁজখবর নেওয়া হয়। ভালোবাসার কোনো অভাব নেই।
অভাব শুধু উপস্থিতির।
ফোনের ওপারে কণ্ঠস্বর শোনা যায়, মুখ দেখা যায়, কিন্তু মানুষটাকে ছুঁয়ে দেখা যায় না।
ব্যস্ততার পৃথিবীতে ছুটি মেলে না সহজে।
মাস পেরিয়ে বছর কেটে যায়।
ফিরে আসা আর হয়ে ওঠে না।
চায়ের কাপে আরেকটি চুমুক দিল অরিন্দম।
মানুষের জীবন বড় অদ্ভুত।
সারাজীবন পরিশ্রম করে সংসার গড়ে তোলে মানুষ। কত স্বপ্ন, কত পরিকল্পনা, কত সঞ্চয়। মনে মনে ভাবে, একদিন ঘর ভরে উঠবে ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনির হাসিতে। বার্ধক্যের বিকেলটা কাটবে তাদের কোলাহলে।
কিন্তু জীবন সবসময় মানুষের পরিকল্পনা মেনে চলে না।
অনেক সময় ঘর থাকে, মানুষ থাকে, স্মৃতি থাকে—
শুধু সেই কোলাহলটা আর ফিরে আসে না।
তবে আশ্চর্যের বিষয়, এত কিছু হারিয়েও মামার মধ্যে কোনো অভিযোগ ছিল না।
অরিন্দম বহুবার দেখেছে, তিনি অন্যদের মতো ভাবেন না।
তার বিশ্বাস ছিল, সন্তানকে বড় করা কোনো বিনিয়োগ নয়, যার প্রতিদান একদিন সুদে-আসলে ফেরত আসবে।
সন্তানকে মানুষ করার অর্থ তাকে নিজের মতো করে বাঁচতে শেখানো।
তার সুখের পথ তৈরি করে দেওয়া।
নিজের সুখের জন্য তাকে আটকে রাখা নয়।
তাই মেয়ের বিয়ের পর যখন বিদেশে স্থায়ী হওয়ার সুযোগ এল, তখন একবারও আপত্তি করেননি তিনি।
আবার অর্ণব যখন উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যেতে চেয়েছিল, তখনও বুকের ভেতরের সমস্ত দুশ্চিন্তা চাপা দিয়ে হাসিমুখেই তাকে বিদায় জানিয়েছিলেন।
মামা প্রায়ই বলতেন,
— "সন্তানকে নিজের কাছে রাখার জন্য মানুষ করিনি। ওরা যেখানে ভালো থাকবে, সেখানেই আমার সুখ।"
কথাগুলো শুনতে খুব সহজ।
কিন্তু সেগুলো সত্যি করে বাঁচতে পারে খুব কম মানুষই।
জানালার ওপারে সন্ধ্যা আরও ঘন হয়ে এসেছে।
অরিন্দমের হঠাৎ মনে হলো, পৃথিবীতে বড় হওয়া আর মহান হওয়া এক জিনিস নয়।
তার মামা হয়তো কোনোদিন বড় মানুষ হননি।
কিন্তু মানুষ হিসেবে তিনি অনেক বড়।
পরের দিন সকালে অফিসে এসে অরিন্দম নিজেই নিজের পরিবর্তনে বিস্মিত হলো।
এত বছর ধরে কাজই ছিল তার একমাত্র আশ্রয়। কাজের চাপে ব্যক্তিগত দুঃখ, একাকীত্ব, অপূর্ণতা—সবকিছুকেই সে আড়াল করে রাখতে শিখেছিল। অথচ আজ বারবার মন অন্যদিকে চলে যাচ্ছে।
কম্পিউটারের স্ক্রিনে খোলা রিপোর্ট, মিটিংয়ের নোট, জরুরি ই-মেইল—কোনো কিছুতেই মন বসছে না।
মাঝে মাঝেই মনে পড়ে যাচ্ছে মামার কথা।
মামিমার কথা।
বয়স হয়েছে দু'জনেরই।
যারা নিজের সন্তানের মতো করে তাকে মানুষ করেছেন, তাদের কাছে অনেকদিন যাওয়া হয়নি।
হঠাৎ করেই মনটা কেমন আকুল হয়ে উঠল।
অবশেষে দুপুরের দিকে কয়েক দিনের ছুটির আবেদন করে একটি মেইল পাঠিয়ে দিল সে।
মেইলটা পাঠানোর পর বুকের ভেতর যেন অদ্ভুত এক স্বস্তি অনুভব করল।
তবু কাজের চাপ শেষ করতে করতে সন্ধ্যা পেরিয়ে গেল।
ঘড়িতে তখন প্রায় সাতটা।
ল্যাপটপ বন্ধ করতে গিয়েই হঠাৎ মনে পড়ল—
আজ তো অফিসের ড্রাইভার রতনের মেয়ের বিয়ে।
কয়েক মাস ধরেই লোকটা বিয়ের প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত ছিল। আর্থিক সমস্যার কথা জানতে পেরে অরিন্দম যথাসাধ্য সাহায্যও করেছিল।
নিমন্ত্রণ করার সময় রতন বারবার বলেছিল,
— "স্যার, একবার আসবেন কিন্তু। আপনি না এলে আমার খুব খারাপ লাগবে।"
অফিসের নিমন্ত্রণবাড়িতে যাওয়ার অভ্যাস অরিন্দমের কোনোদিনই ছিল না।
তবু রতনের আন্তরিক অনুরোধ এড়িয়ে যেতে পারেনি।
ভাবল, যাওয়ার আগে একটা উপহার কিনে নেওয়া যাক।
গাড়ি ঘুরল কাছের একটি বড় শপিং মলের দিকে।
মলে ঢুকেই অরিন্দম থমকে দাঁড়াল।
সামনেই সৌমেন।
আর তার পাশে মেঘলা।
কয়েক সেকেন্ডের জন্য যেন পরিস্থিতিটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হলো তার।
এত বড় শহরে, এত তাড়াতাড়ি, এভাবে আবার দেখা হয়ে যাবে—ভাবেনি।
সৌমেন প্রথমেই চিৎকার করে উঠল,
— "আরে! এ যে অরিন্দম!"
তারপর হাসতে হাসতে এগিয়ে এল।
মেঘলাও ভদ্রভাবে নমস্কার করল।
অরিন্দম প্রতিনমস্কার জানাল।
— "আপনি এখানে?" মেঘলা প্রশ্ন করল।
— "একটা বিয়ের উপহার কিনতে এসেছি।"
— "আমরাও কিছু কেনাকাটা করতে এসেছি।"
খুব সাধারণ কথোপকথন।
তবু কথাগুলো অরিন্দমের কানে অদ্ভুতভাবে রয়ে গেল।
মেঘলার চোখ দুটো আজও ঠিক ততটাই শান্ত।
কাজলে ঘেরা গভীর চোখ।
ঠোঁটের কোণে মৃদু, সংযত এক হাসি।
সেই হাসিতে কোনো বাড়তি উচ্ছ্বাস নেই, কোনো কৃত্রিমতাও নেই।
তবু কেন যেন মনে হয়, মানুষটি হাসলে চারপাশের কোলাহল একটু কমে যায়।
কিছু কিছু মুখ খুব অল্প সময়ের জন্য জীবনে আসে।
কিন্তু অদ্ভুতভাবে মনে থেকে যায়।
— "জামাইবাবু আপনার খুব প্রশংসা করে।"
অরিন্দম হালকা হেসে বলল,
— "বন্ধুরা সাধারণত দু'ধরনের কাজ করে। হয় অযথা প্রশংসা করে, নয়তো অযথা বদনাম করে। আশা করি প্রথমটাই করেছে।"
মেঘলা মৃদু হেসে কফির কাপে চুমুক দিল।
কথা এগোতে লাগল।
একসময় কথার ফাঁকেই অরিন্দম বলে ফেলল,
— "তাহলে বিয়ের কথা ভাবেননি?"
প্রশ্নটা করার পরই সে নিজেকে একটু অস্বস্তিতে পড়তে দেখল। এত অল্প পরিচয়ে এমন ব্যক্তিগত প্রশ্ন করা বোধহয় ঠিক হলো না।
কিন্তু মেঘলা যেন তার অস্বস্তিটা বুঝতে পারল।
ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে বলল,
— "আপনি বিয়ে করেননি কেন?"
অরিন্দম হেসে ফেলল।
— "আমার জাহাজ যে নোঙর করবে এমন কোনো নিরাপদ বন্দর খুঁজে পাইনি।"
— "নাকি খুঁজতেই চাননি?"
— "দুটোই হতে পারে।"
মেঘলা মাথা নাড়ল।
— "তা হলে আমাদের অবস্থাও প্রায় একই।"
— "আপনার ক্ষেত্রে?"
— "আমার জাহাজও এখনও সমুদ্রে ভাসছে। কোথাও নোঙর ফেলার মতো তেমন প্রয়োজন বোধ করিনি।"
দু'জনেই হেসে উঠল।
কয়েক মুহূর্ত নীরবতার পর অরিন্দম বলল,
— "এখন আর এসব নিয়ে বিশেষ ভাবিও না। এই বয়সে এসে মানুষ অনেক কিছু মেনে নিতে শিখে যায়।"
মেঘলা সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করল।
— "এই বয়স মানে? আপনি এমনভাবে বলছেন যেন আশি বছর বয়স হয়ে গেছে!"
অরিন্দম হেসে বলল,
— "বেয়াল্লিশ কম নাকি?"
মেঘলা এবার বেশ জোর দিয়েই বলল,
— "অবশ্যই কম। আর নিজেকে বৃদ্ধ বলা একেবারেই বাড়াবাড়ি।"
তার চোখে তখন এক ধরনের আন্তরিক দৃঢ়তা।
— "মানুষের বয়স ক্যালেন্ডার ঠিক করে না। কৌতূহল, স্বপ্ন আর নতুন করে শুরু করার সাহস ঠিক করে। সেই হিসাবে আপনি মোটেই বৃদ্ধ নন।"
কথাগুলো খুব সাধারণ ছিল।
তবু কেন জানি না, অরিন্দমের মনে হলো বহুদিন পর কেউ তাকে তার পদবি, সাফল্য বা বয়স দিয়ে নয়—মানুষ হিসেবে বিচার করল।
আর সেই অনুভূতিটা আশ্চর্যরকম ভালো লাগল।
অরিন্দম মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
— "আপনার কথায় যুক্তি আছে। তবে সবাই তো আর আপনার মতো ভাবে না।"
মেঘলা জানালার ওপারে সন্ধ্যার আলো-আঁধারি দিকে তাকাল।
তারপর ধীর স্বরে বলল,
— "সব মানুষের জীবন এক ছাঁচে তৈরি হয় না।"
— "মানে?"
— "সংসার খুব সুন্দর একটা জিনিস। কিন্তু সেটাই জীবনের একমাত্র গন্তব্য—এটা আমি বিশ্বাস করি না।"
তার কণ্ঠে কোনো তিক্ততা ছিল না।
ছিল শুধু এক শান্ত দৃঢ়তা।
— "আমার কখনও মনে হয়নি, শুধু সমাজের নিয়ম মেনে বিয়ে করতেই হবে।"
কিছুক্ষণ থেমে সে আবার বলল,
— "আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মতো সংসার, সন্তান, বাজার-ঘরকন্না—এসবের মধ্যে কোনো অসম্মান নেই। বরং খুব বড় দায়িত্ব। অনেকেই সেটা খুব সুন্দরভাবে পালন করেন। কিন্তু আমি বুঝেছিলাম, আমার পথটা বোধহয় একটু আলাদা।"
অরিন্দম মন দিয়ে শুনছিল।
মেঘলার চোখদুটো তখন স্থির।
মনে হচ্ছিল, কথাগুলো সে শুধু বলছে না, বাঁচছে।
— "আমি বরাবরই চেয়েছি নিজের মতো করে কিছু করতে। এমন কিছু, যার মধ্যে শুধু নিজের নয়, অন্যের জীবনও একটু ভালো হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।"
অরিন্দম বলল,
— "তাই সমাজসেবার কাজ?"
— "সমাজসেবা শব্দটা খুব বড় হয়ে যায়। আমি শুধু মনে করি, আমরা সবাই যদি নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী দু-একজন মানুষের পাশে দাঁড়াই, পৃথিবীটা হয়তো একটু সুন্দর হবে।"
মুহূর্তখানেক থেমে সে আবার বলল,
— "জীবনে কিছু মানুষ থাকে, যাদের সুখ নিজের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকে না। অন্য কারও মুখে হাসি ফুটলে তারাও আনন্দ পায়। আমি হয়তো তাদের দলে পড়ি।"
অরিন্দম চুপ করে রইল।
বহু বছর কর্পোরেট জগতে কাটিয়ে সে অসংখ্য সফল মানুষের সঙ্গে পরিচিত হয়েছে। বড় পদ, বড় বেতন, বড় স্বপ্ন—এসবের অভাব ছিল না।
কিন্তু নিজের বিশ্বাসকে এত শান্তভাবে বাঁচতে দেখা মানুষ খুব বেশি পায়নি।
কেন জানি না, মেঘলার কথাগুলো তার মনে গভীরভাবে দাগ কাটছিল।
একজন সাফল্যের পেছনে ছুটেছে।
অন্যজন অর্থের চেয়ে অর্থপূর্ণতার পেছনে।
কফির কাপ প্রায় খালি হয়ে এসেছে।
কাঁচের ওপারে সন্ধ্যা ধীরে ধীরে শহরের ওপর নেমে আসছে।
মলের ব্যস্ত কোলাহলের মাঝেও যেন তাদের টেবিলের চারপাশে এক অদ্ভুত শান্তি তৈরি হয়েছে।
আর অরিন্দমের মনে হচ্ছিল, বহুদিন পর সে এমন
একজন মানুষের সঙ্গে কথা বলছে, যার কথাগুলো শেষ হয়ে যাওয়ার পরও মনের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ ধরে প্রতিধ্বনিত হয়।
গল্পটা বেশ জমে উঠেছিল।
হয়তো আরও অনেকক্ষণ চলত। হয়তো রাত পর্যন্ত।
কিছু মানুষের সঙ্গে পরিচয় হতে সময় লাগে না। কথার পর কথা জন্ম নিতে থাকে। ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে যায়, অথচ সময়ের হিসেব আর মনে থাকে না।
একেই কি মনের মানুষের উপস্থিতি বলে?
অরিন্দম জানে না।
তবে এতটুকু বুঝতে পারছিল, বহুদিন পর কোনো আলাপ তার ভেতরে এমন দীর্ঘ অনুরণন সৃষ্টি করেছে।
ঠিক সেই সময় সৌমেনের ফোন বেজে উঠল।
ফোনের ওপার থেকে আসা খবর শুনে তার মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল।
— "আমাদের এখনই বেরোতে হবে।"
অরিন্দমও ঘড়ির দিকে তাকাল।
রতনের মেয়ের বিয়েতে যাওয়ার কথা।
বিদায়ের আগে মেঘলার দিকে একবার তাকিয়েছিল সে।
মেঘলা মৃদু হেসে বলেছিল,
— "আশা করি আবার দেখা হবে।"
কথাটা খুব সাধারণ।
তবু কেন জানি না, অরিন্দমের মনে হলো এর ভেতরে যেন অদ্ভুত এক উষ্ণতা আছে।
কিছুক্ষণ পর একটি উপহার কিনে সে রতনের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
বিয়েবাড়িতে পৌঁছতেই রতন প্রায় দৌড়ে এসে তাকে অভ্যর্থনা জানাল।
মুখভরা হাসি, চোখেমুখে কৃতজ্ঞতার ছাপ।
— "স্যার, আপনি এসেছেন! আমি ভাবতেই পারিনি।"
অরিন্দম হাসল।
মানুষের জীবনে এমন কিছু আনন্দের মুহূর্ত থাকে, যেখানে উপস্থিত থাকাটাই সবচেয়ে বড় উপহার।
রতনের মেয়ের বয়স খুব বেশি নয়। আঠারো পেরিয়েছে সবে।
লাল বেনারসিতে তাকে বড্ড ছোটো লাগছিল।
বাড়ির উঠোনজুড়ে আত্মীয়স্বজনের ভিড়, রান্নার গন্ধ, মাইকের শব্দ, ছেলেমেয়েদের ছোটাছুটি—সব মিলিয়ে এক অন্যরকম উৎসবের আবহ।
রতনের মুখের দিকে তাকিয়ে অরিন্দমের মনে হলো, গরিব মানুষের কাছে মেয়ের বিয়ে শুধু আনন্দের নয়, অনেক সময় এক বড় দায়িত্ব সম্পূর্ণ হওয়ার স্বস্তিও।
সমাজ বদলেছে।
সময় বদলেছে।
সম্পর্কের সংজ্ঞাও বদলেছে।
একসময় মানুষ খুব অল্প বয়সেই সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিত। আজকের প্রজন্ম অনেক বেশি সময় নিয়ে নিজেদের জীবন, পেশা, স্বপ্ন আর পরিচয় গড়ে তুলতে চায়।
কোনটা ভালো, কোনটা খারাপ—তার সহজ উত্তর নেই।
তবে অরিন্দমের মনে হয়, সময় যতই বদলাক, মানুষের একটি চাওয়া কখনও বদলায় না।
সে চায় কাউকে নিজের কথা বলতে।
কাউকে নিজের আনন্দ আর দুঃখের অংশীদার করতে।
আর সেই কারণেই হয়তো ভালোবাসা, সংসার কিংবা সম্পর্ক—নানা রূপে, নানা নামে—মানুষের জীবনে বারবার ফিরে আসে।
উঠোনের এক কোণে দাঁড়িয়ে এসবই ভাবছিল অরিন্দম।
অথচ আশ্চর্যের বিষয়, তার ভাবনার ফাঁকেফাঁকে বারবার ভেসে উঠছিল কাজলে ঘেরা দুটি শান্ত চোখ।
বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা তখন শুরু হবে হবে। উঠোনজুড়ে আত্মীয়স্বজনের ব্যস্ততা ক্রমশ বেড়ে উঠছে। কেউ অতিথিদের আপ্যায়নে ব্যস্ত, কেউ বরযাত্রীদের দেখাশোনায়। মাইকে সানাইয়ের সুর ভেসে আসছে, আর রঙিন আলোর মালায় ছোট্ট বাড়িটা যেন উৎসবের আবরণে মুড়ে গেছে।
লগ্নের আর খুব বেশি দেরি নেই। পুরোহিত বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছেন। বাড়ির মহিলারা কনেকে প্রস্তুত করার শেষ মুহূর্তের কাজে ব্যস্ত। ঠিক তখনই অরিন্দমের চোখে পড়ল, কনের ঘরের সামনে যেন অকারণ এক অস্থিরতা।
অরিন্দম একপাশে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিল।
হঠাৎ লক্ষ্য করল, কনের ঘরের সামনে অস্বাভাবিক একটা অস্থিরতা।
কয়েকজন মহিলা ফিসফিস করে কথা বলছেন। রতনের স্ত্রী বারবার ঘরের ভেতরে ঢুকছেন আর বেরিয়ে আসছেন।
মুখে স্পষ্ট উদ্বেগ।
কিছুক্ষণ পর রতন প্রায় ছুটে এসে অরিন্দমের সামনে দাঁড়াল।
লোকটার মুখ ফ্যাকাশে।
— "স্যার... একটু আসবেন?"
অরিন্দম অবাক হয়ে তার সঙ্গে ভেতরে গেল।
ঘরের এক কোণে লাল বেনারসি পরে বসে আছে রতনের মেয়ে।
মুখে কান্নার ছাপ।
চোখ দুটো লাল।
অরিন্দমকে দেখে সে মাথা নিচু করে ফেলল।
রতন অসহায় গলায় বলল,
— "সকাল থেকে কিছু খাচ্ছে না স্যার। এখন বলছে বিয়ে করবে, কিন্তু একটা কথা না শুনলে মণ্ডপে যাবে না।"
অরিন্দম মেয়েটির দিকে তাকাল।
— "কী কথা?"
মেয়েটি ইতস্তত করছিল।
শেষ পর্যন্ত নিচু গলায় বলল,
— "আমি পড়তে চাই।"
ঘরের সবাই চুপ।
মেয়েটি আবার বলল,
— "বিয়েতে আমার আপত্তি নেই। বাবা যা ঠিক করেছে, আমি তাই করব। কিন্তু আমি পড়াশোনা বন্ধ করতে চাই না।"
তার গলাটা কেঁপে উঠল।
— "আমি কলেজে ভর্তি হতে চাই।"
এক মুহূর্তের জন্য ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
বাইরে তখন শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি, সানাইয়ের সুর।
আর ভেতরে বসে এক আঠারো বছরের মেয়ে নিজের ভবিষ্যতের জন্য অনুমতি চাইছে।
অরিন্দমের হঠাৎ মেঘলার কথা মনে পড়ল।
"সব মানুষের জীবন এক ছাঁচে তৈরি হয় না..."
সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
— "ছেলের বাড়ির লোকজন কোথায়?"
কিছুক্ষণ পর ছেলের বাবা ও ছেলেকে ডাকা হলো।
অরিন্দম শান্ত গলায় পুরো বিষয়টা বলল।
সবাই উদ্বিগ্ন হয়ে ছিল।
কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে ছেলেটি নিজেই প্রথম কথা বলল।
— "এতটুকু ব্যাপার নিয়ে এত চিন্তা করছেন কেন?"
সবাই তার দিকে তাকাল।
ছেলেটি হেসে বলল,
— "ও পড়তে চাইলে অবশ্যই পড়বে। আমি নিজেও তো গ্র্যাজুয়েশন শেষ করছি। পড়াশোনা বন্ধ করার প্রশ্নই ওঠে না।"
মেয়েটির চোখে জল চলে এল।
রতন যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।
ছেলের বাবা মৃদু হেসে বললেন,
— "আজকাল মেয়েরা পড়াশোনা করবে, নিজের পায়ে দাঁড়াবে—এটাই তো স্বাভাবিক।"
ঘরের ভারী পরিবেশ মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেল।
কনের মুখে ধীরে ধীরে হাসি ফুটে উঠল।
বাইরে তখন বিয়ের মন্ত্রপাঠ শুরু হয়েছে।
অরিন্দম নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে এল।
তার মনে হচ্ছিল, সমাজ বদলাচ্ছে।
ধীরে।
খুব ধীরে।
তবু বদলাচ্ছে।
আর সেই পরিবর্তনের মধ্যেই হয়তো ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় আশা লুকিয়ে আছে।
উঠোনের এক কোণে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকাল সে।
অদ্ভুতভাবে আবার মেঘলার কথাগুলো মনে পড়ল।
কিছু মানুষ জীবনে আসে, আর অজান্তেই মানুষের
ভাবনার ভেতর নতুন জানালা খুলে দেয়।
রতনের সঙ্গে দেখা করে, নবদম্পতিকে আশীর্বাদ জানিয়ে এবং বিদায় নিয়ে অরিন্দম গাড়িতে উঠে বসল।
রাত তখন বেশ নেমে এসেছে।
শহরের আলো একে একে জ্বলে উঠেছে। উড়ালপুলের গায়ে গায়ে আলোর মালা, রাস্তার দু'ধারে সারি সারি দোকানের সাইনবোর্ড, কোথাও ফাস্টফুডের দোকানে ভিড়, কোথাও রাতের শেষ বাস ধরার তাড়া।
অরিন্দম গাড়ি চালাতে লাগল।
কিন্তু আজ তার বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করছিল না।
কোনো অদৃশ্য শূন্যতা যেন তাকে তাড়া করে ফিরছিল।
মনে হচ্ছিল, এই রাস্তা যদি শেষ না হতো!
এই গাড়ি যদি শুধু চলতেই থাকত!
কোনো গন্তব্য ছাড়া, কোনো হিসাব ছাড়া।
শহর ধীরে ধীরে পিছিয়ে যেতে লাগল।
রাস্তার ভিড় কমে এল।
গাড়ির ভেতরে শুধু ইঞ্জিনের মৃদু শব্দ আর এফএম রেডিওতে ভেসে আসা পুরোনো গানের সুর।
কতক্ষণ এভাবে চলেছে সে নিজেও জানে না।
হঠাৎ খেয়াল করল, পরিচিত এক রাস্তার মোড়ে এসে পড়েছে।
অবচেতন মন যেন স্টিয়ারিং ধরে তাকে নিয়ে এসেছে।
গঙ্গার ধারে।
সকালের সেই ঘাট।
গাড়ি পার্ক করে ধীরে ধীরে নেমে এল সে।
রাতের গঙ্গা দিনের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা।
দিনের কোলাহল নেই।
আছে শুধু এক গভীর, অনন্ত নীরবতা।
বাঁধানো ঘাটের সিঁড়িগুলো জ্যোৎস্নার ম্লান আলোয় আবছা দেখা যাচ্ছে। দূরে কোথাও মন্দিরের ঘণ্টা বেজে উঠল। মাঝনদীতে একটি নৌকা ধীরে ধীরে ভেসে যাচ্ছে।
হাওয়ার সঙ্গে ভেসে এল কোনো মাঝির গলা।
পুরোনো এক ভাটিয়ালি সুর।
নদীর বুক চিরে সেই গান যেন দূর অন্ধকার থেকে উঠে এসে আবার অন্ধকারেই মিলিয়ে যাচ্ছে।
অরিন্দম সিঁড়ির ওপর বসে পড়ল।
সামনের কালো জলের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কত কথা মনে পড়তে লাগল।
ফেলে আসা শৈশব।
মামা-মামিমা।
কর্পোরেট জীবনের দীর্ঘ পথচলা।
অসংখ্য অর্জন।
আর সেইসব অর্জনের মাঝখানে কোথাও হারিয়ে যাওয়া কিছু অনুভূতি।
অদ্ভুতভাবে আবার মনে পড়ল মেঘলার কথা।
বিকেলের কফিশপ।
কাজলে ঘেরা দুটি চোখ।
শান্ত, স্থির কণ্ঠস্বর।
বিদায়ের আগে মেঘলা তার ফোন নম্বর দিয়েছিল।
বলেছিল,
— "প্রয়োজনে ফোন করবেন।"
অরিন্দম হেসে বলেছিল,
— "অপ্রয়োজনে করলে রাগ করবেন না তো?"
মেঘলার হাসিটা এখনও স্পষ্ট মনে আছে।
অরিন্দম পকেট থেকে মোবাইল বের করল।
নম্বরটা সেভ করা আছে।
আঙুল একবার স্ক্রিনের ওপর থেমে গেল।
তারপর আবার সরিয়ে নিল।
এই মুহূর্তে হয়তো মেঘলা ঘুমিয়ে পড়েছে।
হয়তো বই পড়ছে।
হয়তো কোনো কাজের পরিকল্পনা করছে।
হয়তো একেবারেই তার কথা ভাবছে না।
ভাবনাটা আসতেই নিজের অজান্তে অরিন্দম হেসে ফেলল।
তারপরই একটু অস্বস্তি বোধ হলো।
কি হচ্ছে তার?
কিসের এত আকর্ষণ?
কেন বারবার মেঘলার মুখ মনে পড়ছে?
এ কি শুধুই দীর্ঘ একাকীত্বের প্রতিক্রিয়া?
নাকি এর চেয়েও বেশি কিছু?
নিজের মনকে সে নিজেই ধমক দিল।
মেঘলার সঙ্গে তার পরিচয়ই বা কতটুকু?
দু-একবার দেখা হয়েছে, কয়েক ঘণ্টা কথা হয়েছে।
এর বেশি কিছু নয়।
আর মেঘলা নিজেই তো স্পষ্ট করে বলেছে, প্রচলিত প্রেম বা সংসার নিয়ে তার বিশেষ আগ্রহ নেই।
তাহলে কেন?
কেন এই মুখটা বারবার ফিরে আসছে?
গঙ্গার কালো জলের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল অরিন্দম।
তারপর মাথা নাড়ল।
না।
এমন চিন্তাকে আর প্রশ্রয় দেওয়া ঠিক হবে না।
এ নিছক আবেগ।
নিতান্তই ছেলেমানুষি।
জীবন তাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে।
এই বয়সে এসে অনুভূতির চেয়ে বাস্তবতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তবু মনের গভীরে কোথাও একটা কণ্ঠস্বর যেন ফিসফিস করে বলছিল—
সব বাস্তবতারও কি ব্যাখ্যা থাকে?
মোবাইলটা আবার পকেটে রেখে দিল অরিন্দম।
নদীর ওপার থেকে আসা হাওয়ায় হালকা শীতের ছোঁয়া। জোয়ারের জল ধীরে ধীরে ঘাটের সিঁড়িতে আছড়ে পড়ছে। দূরে কোথাও একটা লঞ্চের হর্ন রাতের নিস্তব্ধতাকে খানিকটা চিরে দিয়ে আবার মিলিয়ে গেল।
ঘাটে লোকজন প্রায় নেই বললেই চলে।
দু-একজন সাধু কম্বল জড়িয়ে বসে আছে। কয়েকজন মাঝি নৌকা বেঁধে বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে। নদীর কালো বুকের উপর ছড়িয়ে আছে শহরের অসংখ্য আলোর ভাঙা প্রতিবিম্ব।
অরিন্দমের হঠাৎ মনে হলো, মানুষের জীবনও বুঝি এই নদীর মতো।
উপরে শান্ত।
ভেতরে অনন্ত স্রোত।
বাইরে থেকে যতটা সহজ মনে হয়, গভীরে ততটাই অজানা।
সে উঠে দাঁড়াল।
রাত অনেক হয়েছে।
কাল অফিসে আর যাওয়ার প্রয়োজন নেই। ছুটির আবেদন মঞ্জুর হয়ে গেছে। পরশু মামার বাড়ি যাবে।
গাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে আবার মেঘলার কথা মনে পড়ল।
অদ্ভুত মেয়ে।
যে যুগে মানুষ নিজের জন্য বাঁচতেই সময় পায় না, সেই যুগে সে অন্য মানুষের কথা ভাবে।
যে যুগে সবাই কিছু পেতে চায়, সে যেন কিছু দিতে চায়।
হয়তো এই কারণেই তাকে আলাদা মনে হয়েছে।
হয়তো এর বেশি কিছু নয়।
নিজেকে এই যুক্তিই দিল অরিন্দম।
গাড়িতে উঠে ইঞ্জিন স্টার্ট করল।
কিন্তু গাড়ি চলতে শুরু করার আগেই মোবাইলের স্ক্রিনটা একবার জ্বলে উঠল শব্দ করে।
একটি মেসেজ।
অপরিচিত নয়।
নামটা দেখেই বুকের ভেতর কোথাও যেন হালকা একটা ধাক্কা লাগল।
মেঘলা।
মেসেজটা খুব ছোট।
"বাড়ি পৌঁছেছেন তো?"
অরিন্দম কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
কয়েক ঘণ্টা আগেও সে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করছিল, এসব ভাবনা নিছক আবেগ।
নিতান্তই ছেলেমানুষি।
কিন্তু মানুষ যতই যুক্তির দেয়াল তুলুক, জীবনের কিছু মুহূর্ত সেই দেয়ালে নিঃশব্দে একটি জানালা খুলে দেয়।
রাতের নিস্তব্ধ গঙ্গার ধারে বসে অরিন্দম প্রথমবার অনুভব করল—
হয়তো তার দীর্ঘ একাকী জীবনের গল্পে একটি নতুন অধ্যায় নিঃশব্দে দরজায় কড়া নাড়ছে।
x
x
0 Comments